কলকাতা, আনন্দপুর:
শহরের বুকে আবারও এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড। আগুনে ঝলসে প্রাণ হারালেন কয়েকজন শ্রমিক। দগ্ধ দেহ, অসহায় আর্তনাদ, আতঙ্কিত পরিবার — এই দৃশ্য নতুন নয়, কিন্তু প্রতিবারই যেন আমরা আরও অসাড় হয়ে পড়ি।
প্রশ্ন উঠছে — এই মৃত্যু কি শুধুই দুর্ঘটনা? নাকি দীর্ঘদিনের অবহেলা, বেআইনি নির্মাণ, ছাড়পত্রহীন কারখানা, অরক্ষিত শ্রমপরিবেশ এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার ফল?
ঘটনার পর সামনে আসছে একের পর এক তথ্য। সংশ্লিষ্ট স্থাপনার অনুমোদন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বৈধ কাগজপত্র — সব কিছু নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বহুদিন ধরেই ওই এলাকায় বেআইনি নির্মাণ এবং অসুরক্ষিত ব্যবসা চলছিল প্রকাশ্যেই।
কিন্তু এই প্রশ্নগুলো কি আগুন লাগার আগেই কেউ তুলেছিল?
প্রায়শই দেখা যায়, কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার পর রাজনৈতিক তরজা শুরু হয় — কে দায়ী, কার ব্যর্থতা, কার দোষ। কিন্তু বাস্তব হল, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বেআইনি নির্মাণ, অনুমতিহীন কারখানা, এবং শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করার ঘটনা রোজ ঘটছে। অথচ তা নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই তেমন সক্রিয়তা দেখা যায় না, যতক্ষণ না তা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
এই ঘটনায় নিহতরা কোনো পরিসংখ্যান নন। তারা ছিলেন পরিবারের উপার্জনকারী মানুষ, কারও বাবা, কারও স্বামী, কারও ছেলে। তাদের মৃত্যু কেবল কয়েকটি প্রাণহানি নয় — এটি আমাদের শ্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহর ও শহরতলিতে গড়ে ওঠা বহু ছোট-বড় কারখানা এবং গুদামে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ন্যূনতম মানও বজায় থাকে না। নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স নবীকরণ, শ্রমিক সুরক্ষা — এগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে প্রায়শই অদৃশ্য।
ঘটনার পর ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, দুঃখপ্রকাশ, তদন্তের আশ্বাস — এসব পরিচিত চিত্র। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় — এই তদন্তের ফল কি কখনও দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে?
আমরা মনে করি , এই ঘটনা রাজনৈতিক আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের বিষয় নয়। এটি সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।
আমরা দাবি জানাই:
ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত
সংশ্লিষ্ট সমস্ত বেআইনি নির্মাণ ও ব্যবসার তালিকা প্রকাশ
অগ্নি-নিরাপত্তা ও শ্রমিক সুরক্ষার কড়া পরিদর্শন ব্যবস্থা
দোষীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা
নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা
সংবিধানের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব — কোনো রাজনৈতিক রং নয়, শুধুই মানুষের কথা বলা।
কারণ, যখন শ্রমিকের জীবন এত সস্তা হয়ে যায়, তখন তা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয় — সমাজের নৈতিক পরাজয়।
তানি সেনগুপ্ত | Jan -Vani Digital Desk.
